উলগুলানের শেষ নেই, বিরসার মৃত্যু নেই

- Advertisement -
- Advertisement -

কলমেঃ- বিপ্লব সরেন, শিক্ষক -সারেঙ্গা এম এস বিদ্যাপীঠ

আজ ৯ই জুন। ধারতি আবা বিরসা মুন্ডার শহীদ দিবস। শোষিত,বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণার নাম বিরসা । মুক্তিকামী মেহনতী মানুষের হিমোগ্লোবিনে হিল্লোল ও হৃদয়ে তুফান তোলা আবেগের নাম বিরসা। সীমাহীন শোষণ, বঞ্চনা,অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভের আশায় বৃটিশ সরকার ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী দালাল এদেশীয় জমিদার,মহাজনদের বিরুদ্ধে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে ছোটনাগপুরের সমস্ত আদিবাসী ও শোষিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণজাগরন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক মাইলফলক স্বরূপ ।

বিরসা সংক্ষিপ্ত জীবনী:-

১৮৭৫ সালের ১৫ ই নভেম্বর বর্তমান ঝাড়খণ্ডের খুঁটি জেলার উলিহাতু গ্রামে বিরসার জন্ম। পিতার নাম সুগনা মুন্ডা ও মাতা নাম কারমি। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল পরিবেশে বিরসার জন্ম -অভাবী সংসারে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় তার বেড়ে ওঠা এবং আন্দোলনে হাতে খড়ি ।

চরম দারিদ্র্যের জন্যে বিরসাকে ছোট বেলায় মামার বাড়ি আয়ুভাতু তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাশ্ববর্তী শালগাতে শ্রদ্ধেয় জয়পাল নাগের পাঠশালায় শুরু হয় তার প্রাথমিক শিক্ষা। পরে বুর্জু মিশন স্কুল থেকে আপার প্রাইমারি পাশ করেন এবং চাঁইবাসা জার্মান মিশনে উচচশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। জার্মান মিশনে পড়াশোনা করার সময়েই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের ঢেউ বিরসার মনকে নাড়া দেয়। বিরসা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং মিশন থেকে বিতাড়িত হন।

চাঁইবাসা জার্মান মিশন থেকে ফিরে বিরসা জোতদার, জমিদার বিরুদ্ধে জল-জঙ্গল-জমির অধিকারের প্রশ্নে ছোটনাগপুরের আদিবাসী সহ সমস্ত শোষিত মানুষদের সংগঠিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। গরীব, অশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে ব্যক্তিগত জীবনে সৎ,শৃঙ্খলাপরায়ণ, নীতিনিষ্ঠ হওয়ার কথা প্রচার করেন। এর জন্য তিনি নিজস্ব ‘বিরসাইত’ নামে অনুগামী দল তৈরি করেন। সমসাময়িক মহামারী, দুর্ভিক্ষতে এই বিরসাইত বাহিনী মানুষের পাশে থেকে মানুষের গভীর বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে। বিরসার জনপ্রিয়তায় প্রশাসন ভীত হয়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে । ১৮৯৫সালের ২৪শে আগস্ট বিরসাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৮৯৭সালের ৩০শে নভেম্বর তিনি মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় মানুষকে সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়েন এবং সশস্ত্র সংগ্রাম বা ‘উলগুলান ‘এর ডাক দেন। ডোমবারি বুরু ও সাইলরাকাব পাহাড়ে নিজের গোপন কর্মকান্ড শুরু করেন। ১৮৯৯ সাল নাগাদ রাঁচি ,সোনাপুর,চাঁইবাসা, খুঁটি এলাকা তে বিরসার অনুগামীরা সশস্ত্র আক্রমণ সংগঠিত করে। অত্যাচারী জমিদার,মহাজন দের হত্যা করে এবং থানা জ্বালিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত বৃটিশ বাহিনীর কাছে অসম লড়াইয়ে বিরসার অনুগামীরা পর্যদুস্ত হয়। বিরসাকে গ্রেফতারের জন্য বৃটিশ বাহিনী মরিয়া হয়ে উঠলে, বিরসা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। ১৯০০সালের ৩রা মার্চ বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় বিরসাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিরসা প্রথমে চাঁইবাসা জেলে, পরে অসুস্থ অবস্থায় রাঁচি জেলে বন্দী হন। ১৯০০সালের ৯ই জুন জেলবন্দী অবস্থায় বিরসার মৃত্যু হয়। পরে জানা যায় বিরসা বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল ।

বিরসা মুন্ডার জীবনাদর্শ চর্চার প্রাসঙ্গিকতা: –

আমাদের জন্মভূমি ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়ে প্রায় ৭২ বছর অতিক্রান্ত। কিন্তু যে শোষণ, জুলুম, অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভের জন্য বিরসা বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও অপূরিত। একদিকে পুঁজিপতি শ্রেনীর সীমাহীন লোভের বশবর্তী হয়ে মুনাফার গদিতে বসার তীব্র প্রতিযোগিতা আর অন্যদিকে শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িতদের করুন আর্তনাদ। আজও অন্তহীন দারিদ্র্য ও বেকারি। কলকারখানা বন্ধ; ছাঁটাই, সাসপেনশন হচ্ছে। শ্রমিকদের জীবনে এক চরম অনিশ্চয়তা নেমে আসছে। ঋণভারে জর্জরিত লক্ষ লক্ষ কৃষক আজ আত্মহত্যার মিছিলে সামিল হচ্ছে। দেশের একটা ক্ষুদ্র অংশের হাতে প্রযুক্তির ব্যবহার কর্মচ্যুতির পথকে প্রশস্ত করছে। গ্রামের মানুষ কাজের সন্ধানে শহরে ভীড় বাড়াচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ক্রমবর্ধমান ।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিরসা মুন্ডার জীবনাদর্শ চর্চা খুবই প্রাসঙ্গিক। শোষণ, অত্যাচার থেকে মুক্তির প্রশ্নে বিরসা সেদিন মানুষকে আলোকপথের ঠিকানা, মুক্তিপথের নিশানা দেখিয়েছিলেন। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ।শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের মনে আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার করে নিজেদের অধিকারবোধ সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন। তাই বিরসা আজও শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের মনণে, রক্তে মিশে আছেন; মেহনতি, মুক্তিকামী মানুষের অন্তরে আছেন; ক্রান্তিকারী, লড়াকু মানুষের প্রতিবাদী কন্ঠে আছেন ।

তথ্যসূত্র: -“হুল তারাস” বুলেটিন, ভারতীয় আদিবাসী :অমল কুমার মন্ডল

- Advertisement -

Latest news

ডেঙ্গু বিজয় অভিযান আসানসোলে।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডেঙ্গু বিজয় অভিযানের অংশ হিসেবে আজ কুলটিতে ডেঙ্গু বিজয় অভিযান শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে কুলটি বোরো অফিস...
- Advertisement -

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে ছাড়া হল জল।

গ্রাম বাংলাঃ মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে নদীতে ছাড়া হল জল। সেচ দফতর সূত্রে খবর, মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে পাঁচ হাজার কিউসেক জল...

সাধনা ও শান্তির স্থান পঞ্চবটির হোল শুভ উদ্বোধন।

নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব মেদিনীপুরঃ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মাতৃ দর্শনের ঐতিহ্য ও তার সাধনাস্থলের মনোরম পরিবেশের কথা মাথায় রেখে পঞ্চবটী বনের  শুভ...

জলপাইগুড়ি চা বাগান থেকে উদ্ধার বিশাল অজগর।

সম্পা ভট্টাচার্য, জলপাইগুড়ি:-কালচিনি ব্লকের ডীমা চা বাগান থেকে একটি বিশালাকার অজগর উদ্ধার করল বনকর্মীরা । শনিবার সকালে ডীমা চা বাগানের বীচ লাইনে...

Related news

ডেঙ্গু বিজয় অভিযান আসানসোলে।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডেঙ্গু বিজয় অভিযানের অংশ হিসেবে আজ কুলটিতে ডেঙ্গু বিজয় অভিযান শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে কুলটি বোরো অফিস...

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে ছাড়া হল জল।

গ্রাম বাংলাঃ মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে নদীতে ছাড়া হল জল। সেচ দফতর সূত্রে খবর, মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে পাঁচ হাজার কিউসেক জল...

সাধনা ও শান্তির স্থান পঞ্চবটির হোল শুভ উদ্বোধন।

নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব মেদিনীপুরঃ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মাতৃ দর্শনের ঐতিহ্য ও তার সাধনাস্থলের মনোরম পরিবেশের কথা মাথায় রেখে পঞ্চবটী বনের  শুভ...

জলপাইগুড়ি চা বাগান থেকে উদ্ধার বিশাল অজগর।

সম্পা ভট্টাচার্য, জলপাইগুড়ি:-কালচিনি ব্লকের ডীমা চা বাগান থেকে একটি বিশালাকার অজগর উদ্ধার করল বনকর্মীরা । শনিবার সকালে ডীমা চা বাগানের বীচ লাইনে...
- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here