ভটাদ সিনি

- Advertisement -
- Advertisement -

কলমে – রামামৃত সিংহ মহাপাত্র

বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত তালডাংরা থানার পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত পাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম হাড়মাসড়া।শিলাবতী নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত এই গ্রাম একদা যে সমৃদ্ধ জৈন ক্ষেত্র ছিল তা বোঝা যায় অবস্থিত জৈন দেউল ,প্রাপ্ত জৈন তীর্থংকর মূর্তি  ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা জৈন পুরাতাত্বিক নিদর্শন গুলি থেকে।এই জৈন ক্ষেত্রে পূজিত হন দেবী ভটাদসিনি।

সিনি পুজো প্রকৃতি পুজোর নামান্তর।অনার্য সংস্কৃতির অঙ্গ এই দেবীর পুজোর সূচনা হয়েছিলো সভ্যতার আদিলগ্নে।তবে ঠিক কোন যুগে এই দেবী পুজোর সূচনা হয়েছিল তা এই সময়ে বসে নির্ণয় করা কঠিন। তবে বলতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় উৎপত্তির মূল কারণ গ্রামের মঙ্গল কামনা,নিজের ও পরিবারের শরীর সুস্থ রাখা,চাষাবাদ এবং গৃহপালিত জীবজন্তুর শ্রীবৃদ্ধি।

ড.মানিকলাল সিংহ প্রথম সিনি দেবী সম্পর্কে তাঁর ‘ষষ্ঠী ও সিনি’ নামক প্রবন্ধে আলোচনা করেন।তিনি লেখেন ‘একদল আদিবাসী ছোট নাগপুরের পাহাড়ী অঞ্চল ছেড়ে কাঁসাই-দ্বারকেশ্বরের প্রবাহ ধরে নেমে এসেছে।এই দুটি ঠাকুরের প্রবর্তন তারাই করেছে।তাঁর মতে ঠাকুর দুটি ফার্টিলিটি বা উর্বরতার প্রতীক।বৃষ্টি ও শস্য বৃদ্ধির জন্য সিনি আরাধনা করতে হয়।তিনি বলেছেন ‘সিনি ঠাকুরগুলি আসলে এক একটি অমসৃন পাথর।বিশেষভাবে বাউরি,বাগদি,মেটে, মাঝি,লোহার,খয়রা প্রভৃতি জাতির মানুষ এর পূজারী। সিনি নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন ‘সিনি ঠাকুরের নামের সঙ্গে মাথনা শব্দের যোগও দেখা যায়।জমিতে সিডনি করে জল দেওয়া হয়।জমির সূচনার জায়গাকে বলে সিনি মাথনা।এর সঙ্গে যে মাথনা সিনির সংযোগ নেই,কে বলতে পারে?’ অন্যদিকে তাঁর মতে ষষ্ঠী ও সিনি পুজোর পাথরকে আরাধ্য দেবতা মনে করাও বিশেষ তাৎপর্যবাহী। এগুলি আসলে প্রস্তর যুগের সভ্যতার সময় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের নিদর্শন। তাঁর মতে সিনি শব্দটি এসেছে ‘দে-আসিনী ‘থেকে। দেব-আসী স্ত্রী লিঙ্গে দেব -আসিনী অর্থাৎ দেবগৃহে পরিচর্যাকারিনী। ( দেব-আসিনী>দে-আসিনী>আসিনী>সিনী বা সিনি)।এমন দে আসিনী পশ্চিমরাঢ়ে একসময় নানাস্থানে বিদ্যমান ছিল। মানিকলালের মতে এমনি সব দেয়াসিনিদের কিছু কিছু নারী কালক্রমে অলৌকিক শক্তি সম্পন্না হয়ে ওঠেন এবং দেবী রূপে পূজা পান। অর্থাৎ বলা যেতে পারে সিনি দেবীরা হলেন পূর্বজ সিদ্ধা নারী পূজার নামান্তর মাত্র। সেই হিসাবে সিনিকে পুর্ব নারী পুজো বলা যেতে পারে।

    অন্যদিকে সিনি শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে ড.সুধীর কুমার করণ বলেছেন ‘সিনি’ শব্দটি বাসিনী শব্দের শেষাংশ বা পরবর্তীকালীন সংক্ষিপ্তায়ন।আবার কারও কারও মতে অষ্ট্রিক শব্দ ‘সুনিয়া’ বা ‘সুনি’ থেকে সিনির উদ্ভব।যার অর্থ আরম্ভ বা আদি। এই আদি বলতে জননী বোঝায়।আদি পিতামাতা বা পূর্ব পুরুষের পূজা থেকে এই সিনির উদ্ভব হতে পারে।

অনেকে আবার অম্বিকা,অম্বালিকার মতো জৈন শাসন যক্ষিণী রূপেও সিনি দেবীকে তুলে ধরেন। একথা প্রমানিত এক সময় জৈন ধর্ম প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ-পশ্চিম রাঢ়ের এই অঞ্চল। জৈন ধর্মগ্রন্থ “আচারঙ্গ সূত্র” থেকে জানা যায় জৈন ধর্মের পীঠস্থান এই অঞ্চলে পাদস্পর্শ ঘটেছিল মহাবীর সহ একাধিক জৈন তীর্থঙ্করের। প্রসঙ্গত একথা ভুললে চলবে না এই অঞ্চলে সর্ব প্রথম জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিল সমাজের নিচু তলার মানুষেরা। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের সঙ্গে নিজেদের অভিন্নতা প্রমাণ করার জন্য জৈনরা তাদের দ্বারা পূজিত অনেক দেবদেবীকে নিজের করে নিয়েছিল।সেই সময়ে যে এই অনার্য দেবী জৈন ধর্ম পরিসরে প্রবেশ করে নি তা সুনিশ্চিত করে বলা যাবে না।

 শাস্ত্রে সিনির অভিধানিক অর্থ বালা,চন্দ্রবালা,দুর্গা।ঐতেরীয় ব্রাহ্মণে এবং ঋগবেদে সিনি দেবী হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে। মহাভারতে সিনি অংগীরার পত্নী ও শ্রদ্ধার কণ্যা।আসলে সিনি দেবীর উৎপত্তি নিয়ে  অথবা দেবীর প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রটি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বিশ্বাস এক এক সিনি এক এক শক্তির প্রতীক। কেউ চাষের দেবী,কেউ সন্তানদাত্রী, কেউ সর্পভয়নিবারণকারিণী,কেউ পশুপালনকারিণী আবার কেউ বা সাক্ষাৎ দুর্গা।সিনি দেবীদের সাধারণ প্রতীক হাতি-ঘোড়া বা পাথর খন্ড। নিম্ন হিন্দু,আদিবাসী বা উপজাতিরাএর উপাসক। পুজোর নৈবেদ্য বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম। মূলত মণ্ডা, দুধ, আলো-চাল,হলুদ, মেথী,তেল সিঁন্দুর,ফল ইত্যাদি। বলি দেবার প্রচলন আছে প্রায় সব থানেই।

   ভটাদ নামে পুকুরের পাড়ে দেবীর থান।হাতি ঘোড়ার প্রতীকে পূজিত হন দেবী।নিত্য পুজো হয় না।মূল পূজা হয় পয়লা মাঘ,এখ্যান যাত্রার দিন।পুজোয় বলির প্রচলন নেই। গবেষকদের মতে বলির প্রচলন না থাকা জৈনদের প্রকৃতি পুজো এবং অহিংসার নীতিকেই বহন করে চলেছে। 

 এবার আসা যাক দেবীর এইরূপ নামকরণ প্রসঙ্গে-‘ভটাদ’ বলতে সাধারণভাবে ভিটে যাওয়া দহ বা হ্রদ বোঝায়।তবে হাড়মাসড়ার ভৌগলিক ও প্রকৃতিগত অবস্থানের সঙ্গে এই ব্যাখ্যা খাপ খায় না। কারণ বাঁকুড়া জেলার খরা প্রবণ এই গ্রামে হ্রদ থাকা সম্ভবপর নয়। তবে এই ‘ভটাদ’ শব্দের ব্যাখ্যা রয়েছে ড. নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালীর ইতিহাস গ্রন্থে।লিখেছেন, ‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে ভট্ট ব্রাহ্মণ নামে এক নিম্ন বা পতিত শ্রেণীর ব্রাহ্মণের খবর পাওয়া যাইতেছে, গ্রাম্য দেবদেবীর পূজার্চনা ও যশোগান করাই ইহাদের উপজীবিকা।’এই পুকুর হয়তো কোন ‘ভট্ট’ বা পতিত ব্রাহ্মণের স্মৃতি বহন করে চলেছে। আর ঐ ব্রাহ্মণ হয়তো জৈন ধর্ম গ্রহণ করার জন্যই পতিত হয়েছিলেন।কারণ প্রথম দিকে জৈন ধর্মাবলম্বীদের এই অঞ্চলের অধিবাসীরা ভালোভাবে নেয়নি।ফলত যারা জৈন ধর্ম গ্রহণ করতো তাদের ‘পতিত’ বলে অভিহিত করতো।এই দেবীর পুজো হয়তো ঐ শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের দ্বারা প্রচলিত হয়েছিল। 

  অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে জৈন ধর্মের যোগ ছিল নিবিড়।তাই যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জৈন ধর্ম অবলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের দেব দেবীর মূর্তি গুলি ওরা হিন্দুধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে পুজো করতে থাকে।এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হাড়মাসড়ার খাঁদাসিনি।সর্প লাঞ্ছন চিহ্ণ যুক্ত পার্শ্বনাথ এর মূর্তিটি বর্তমানে খাঁদাসিনি হিসাবে পূজিত হন। আবার মূর্তি শূন্য জৈন দেউল এখ্যান যাত্রার দিন পূজিত হয় স্থানীয় অন্ত্যজ শ্রেণী দ্বারা। নিকটবর্তী খাঁদাসিনির জঙ্গল এক উৎকৃষ্ট প্রত্নস্থল। প্রসঙ্গত সিমলাপাল থানার লায়েকপাড়া গ্রামে অনুরূপ একটি পার্শ্বনাথ মূর্তিও পূজিত হন খাঁদাসিনি বা খাঁদারানী হিসাবে। জৈন মূর্তির হিন্দু দেবীতে রূরূপান্তরের এটি একটি সার্থক উদাহরণ। 

   শুধু জৈন ধর্মের নয়।কালের প্রবাহে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব পড়েছিল হাড়মাসড়া গ্রামে।ভটাদ সিনি,কেশাতড়া গ্রামের পুতুলা সিনি এবং ভীমাড়া গ্রামের ডাকাত সিনির পুজো পদ্ধতি এই বক্তব্যের সমর্থন জোগায়। এই অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব বেড়েছিল বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের দৌলতে। বিষ্ণুপুরের রাজা বীর হাম্বীর কর আদায়ের জন্য বর্ধমানের কোগ্রাম থেকে এখানকার অধিবাসী রায়দের নিয়ে আসেন।রায় পরিবারের বর্ষীয়ান লেখক অদ্বৈত রায়ের দাবী পরম বৈষ্ণব লোচন দাসের ভাই ক্ষুদিরাম কর আদায়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম এখানে আসেন।পূর্বে এরা রায় ঘাটোয়াল উপাধি লিখতেন।কালক্রমে রায় ঘাটোয়াল থেকে বর্তমানে শুধু রায় ব্যবহার করেন।এদের হাত ধরেই বৈষ্ণব ধর্ম বিস্তার লাভ করে এই অঞ্চলে। উল্লিখিত সিনি থানগুলি পূজিত হন গ্রাম দেবীরূপে।পূজারী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। পুজোর পর খিঁচুড়ি প্রসাদ বিতরণ করা হয়। 

- Advertisement -

Latest news

দীঘার মাছের বাজারে আগুন, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।

নিজস্ব সংবাদদাতা,পূর্ব মেদিনীপুর ঃ শনিবার গভীররাতে দীঘার পাইকারী মাছের বাজারে আগুন লাগার ঘটনায় ব্যপক চাঞ্চল্য ছড়াল এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে খবর, শনিবার পূর্ব...
- Advertisement -

পি. মোড় – ব্রাহ্মণ ডিহা রাস্তার বেহাল দশা, দুর্ভোগ জনতার।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পিড়রগাড়ী মোড় থেকে ব্রাহ্মণডিহা রাস্তার বেহাল দশা, আশ্বাসবাণী সভাধিপতির,কটাক্ষ বিজেপির। বাঁকুড়ার সারেঙ্গা ব্লকের পিড়রগাড়ী মোড় থেকে ব্রাহ্মণডিহা বেহাল...

ডেঙ্গু বিজয় অভিযান আসানসোলে।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডেঙ্গু বিজয় অভিযানের অংশ হিসেবে আজ কুলটিতে ডেঙ্গু বিজয় অভিযান শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে কুলটি বোরো অফিস...

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে ছাড়া হল জল।

গ্রাম বাংলাঃ মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে নদীতে ছাড়া হল জল। সেচ দফতর সূত্রে খবর, মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে পাঁচ হাজার কিউসেক জল...

Related news

দীঘার মাছের বাজারে আগুন, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।

নিজস্ব সংবাদদাতা,পূর্ব মেদিনীপুর ঃ শনিবার গভীররাতে দীঘার পাইকারী মাছের বাজারে আগুন লাগার ঘটনায় ব্যপক চাঞ্চল্য ছড়াল এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে খবর, শনিবার পূর্ব...

পি. মোড় – ব্রাহ্মণ ডিহা রাস্তার বেহাল দশা, দুর্ভোগ জনতার।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পিড়রগাড়ী মোড় থেকে ব্রাহ্মণডিহা রাস্তার বেহাল দশা, আশ্বাসবাণী সভাধিপতির,কটাক্ষ বিজেপির। বাঁকুড়ার সারেঙ্গা ব্লকের পিড়রগাড়ী মোড় থেকে ব্রাহ্মণডিহা বেহাল...

ডেঙ্গু বিজয় অভিযান আসানসোলে।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডেঙ্গু বিজয় অভিযানের অংশ হিসেবে আজ কুলটিতে ডেঙ্গু বিজয় অভিযান শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে কুলটি বোরো অফিস...

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে ছাড়া হল জল।

গ্রাম বাংলাঃ মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে নদীতে ছাড়া হল জল। সেচ দফতর সূত্রে খবর, মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে পাঁচ হাজার কিউসেক জল...
- Advertisement -

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here