“হুল দিবস” ! না “হুল উৎসব”?

- Advertisement -
- Advertisement -

কলমে – বিপ্লব সরেন, শিক্ষক, সারেঙ্গা এম.এস. বিদ্যাপীঠ

হুল দিবস কি?

আমাদের জন্মভূমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাঁওতাল বিদ্রোহ একটি মাইলফলক স্বরূপ ।সীমাহীন শোষণ, বঞ্চনা,অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভের আশায় বৃটিশ সরকার ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী দেশীয় জমিদার,মহাজনদের বিরুদ্ধে সিধু-কানু-চাঁদ-ভৈরব দের নেতৃত্বে সাঁওতালদের ঐক্যবদ্ধ গণজাগরন ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে ।সাঁওতাল বিদ্রোহ আপোসহীন গণসংগ্রামের যে উজ্বল দৃষ্টান্ত দিয়ে গেছে, তা আমাদের দেশের মুক্তিকামী মেহনতি মানুষের কাছে প্রেরণার অফুরন্ত উৎস হয়ে রয়েছে ।শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আগুনের স্ফুলিঙ্গ দাবানলে রূপ নিয়েছিল ১৮৫৫ সালের ৩০ শে জুন ।ঐ ৩০ শে জুন তারিখেই ভগনাডিহির মাঠে সিধু-কানুর নেতৃত্বে গণজমায়েতের মধ্য দিয়ে ‘হুল ‘ অর্থাৎ বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ।সাঁওতাল বিদ্রোহের অমর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজও ৩০শে জুন ঐতিহাসিক ‘হুল দিবস’ পালন করা হয় ।

হুল দিবস না হুল উৎসব?

বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা গেছে ১৯৫৪ সালের ৩০ শে জুন বীরভূমের সাঁইথিয়াতে ও ঐ বছরই বাঁকুড়া জেলার সারেঙ্গার খয়েরপাহাড়িতে গণজমায়েতের মধ্য দিয়ে ‘হুল দিবস ‘ উদযাপনের সূচনা হয় ।এছাড়াও ১৯৫৬ সালের ৩০শে জুন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ থানার বেলতারা গ্রামের নাথানিয়েল মুরমু ও দেবী সরেনের উদ্যোগে শতবার্ষিকী ‘হুল দিবস ‘উদযাপন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।তার পর থেকে বিভিন্ন ক্লাব ,সংগঠন, সংস্থার পক্ষ থেকে ও সরকারিভাবে ‘হুল দিবস ‘ পালিত হয়ে আসছে ।কিন্তু বর্তমানে সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ‘হুল দিবস ‘ পালনের যেতে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসছে ‘হুল দিবস’ না ‘হুল উৎসব ‘?বাজারী সংবাদপত্র ও মিডিয়া গুলো সচেতন ভাবেই হোক আর অবচেতন ভাবেই হোক ঐতিহাসিক ‘হুল দিবস’ কে হুল উৎসব হিসেবে পরিবেশন করে চলেছে ।ইতিহাস অজ্ঞ, জ্ঞানচর্চা বিমুখ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরাও ‘হুল দিবস’কে হুল উৎসব আখ্যা দিয়ে নিজেদের অর্বাচীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন ।’হুল দিবস’ পালন আজ অনেককে ‘আদিবাসী প্রেমী’ প্রমান করার সুযোগ এনে দিয়েছে ।বিভিন্ন সংগঠন এমনকি সরকারি ভাবেও ‘হুল দিবস’এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব,প্রাসঙ্গিকতা, মর্যাদা বিষয়ে আলোচনাকে গুরুত্ব না দিয়ে, ‘হুল ‘ এর শিক্ষাকে নবপ্রজন্মের কাছে তুলে না ধরে, নাচে-গানে সাঁওতালদের মাতিয়ে রেখে ,’হুল দিবস’ কে ‘হুল উৎসব ‘-এ বিকৃত করার নোংরা পথকে প্রশস্ত করা হচ্ছে ।

ঐতিহাসিক ‘হুল দিবস’কে ‘হুল উৎসব’- পরিবেশন করা শুধু ইতিহাসকে বিকৃত করা নয় ,বীর শহীদদের সংগ্রামী চেতনা ও আত্মবলিদানকে অপমান করা ।মনে রাখতে হবে, ১৮৫৫সালের ৩০ শে জুন ভগনাডিহির মাঠে সিধু-কানুরা ধামসা মাদল নিয়ে নাচগান বা উৎসবের আয়োজন করেন নি;শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘আপনার দিশমরে আপনার রাজ’ তথা ‘নিজ ভূমে নিজ রাজ ‘ কায়েম করার লক্ষ্যে সারজম গিরার (শালগিরা)ডাকে হাজার হাজার সাঁওতাল সেদিন ‘হুল’ অর্থাৎ বিদ্রোহের শপথ নিয়েছিল ।তাই হুল দিবসকে কখনোই হুল উৎসব বলা যাবে না ।’হুল দিবস’ হল লড়াই -এর শপথ নেওয়ার দিন।এ লড়াই বাঁচার লড়াই -এ লড়াই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই -এ লড়াই নিজের জাতি-ধর্ম -সংস্কৃতি কে অক্ষুণ্ণ রাখার লড়াই ।এ লড়াই আদিবাসী প্রেমের মুখোশ পরা নীতিহীন দেশসেবকদের মুখোশটাকে ছিঁড়ে ফেলার লড়াই ।এ লড়াই চলমান সামাজিক স্থিতাবস্থা বা statuesque কে পরিবর্তন করে নতুন সমাজ গড়ার লড়াই ।

সাঁওতাল বিদ্রোহের তাৎপর্য্য :-

# পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেও ,অসম যুদ্ধে, সাংগঠনিক দক্ষতার অভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়েছিল।কিন্তু প্রবল প্রতাপশালী বৃটিশরা সারা ভারতবর্ষের বুকে যে অপরাজেয় ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ সেই ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করেছিল ।সাঁওতাল বিদ্রোহীদের লড়াকু মানসিকতা ও সংগ্রামী চেতনা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সিপাহীরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ।তাই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সিপাহী বিদ্রোহ নয় সাঁওতাল বিদ্রোহকেই প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে অভিহিত করা যায় ।এই প্রসঙ্গে ভি.রাঘবাইয়া তাঁর ‘Tribal Revolts ‘ গ্রন্থে বলেছেন -“এ প্রসঙ্গে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারতবর্ষের ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ যাকে ভুল করে সিপাহি বিদ্রোহ নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে, সেটা সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় ভ্রূণাবস্থায় ছিল ।সেই মহাবিদ্রোহ সাঁওতাল বিদ্রোহের কাছ থেকে মূল্যবান অনুপ্রেরণাই নয়,বিদ্রোহের পথিকৃতদের ভুল থেকেও মূল্যবান শিক্ষা লাভ করেছিল “।স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক সুপ্রকাশ রায় তাঁর “ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম”গ্রন্থে বলেছেন “সাঁওতালদের এই স্বাধীনতার যুদ্ধ যে পাশ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলের জনসাধারণকে এবং দু-বৎসর পরের মহাবিদ্রোহে (১৮৫৭) স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই “।

## ভারতবর্ষের বৃটিশ শাসনের প্রধান দুই স্তম্ভ ছিল জমিদার ও মহাজন ।জমিদার,মহাজন ও বৃটিশদের মিলিত শোধনযন্ত্রে প্রথম আঘাত হেনেছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ ।ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের ভিত্তিমূলকে সাঁওতাল বিদ্রোহ কাঁপিয়ে দিয়েছিল ।

### এই বিদ্রোহের ফলস্বরূপ সাঁওতালদের জন্য ‘সাঁওতাল পরগণা’ নামে একটি নন-রেগুলেটেড জেলা গঠন করা হয় ।শুধু ভারতবর্ষ না ভারতের বাইরেও সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা ছড়িয়ে পড়ে ।এমনকি বৃটিশ পার্লামেন্টেও সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা আলোচিত হয়েছিল ।সাঁওতাল জাতির পরিচয় দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।পরাধীন ভারতবর্ষে ‘সাঁওতাল পরগণার ‘ আত্মপ্রকাশ এক যুগান্তকারী ঘটনা ।

####সীমাহীন শোষন, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সিধু-কানুর নেতৃত্বে সাঁওতাল জনগণ ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজধানী ‘কলকাতা অভিযান’-এ সামিল হয়েছিল ।মাও-সে-তুং এর লং-মার্চের বহু পূর্বেই এই গণঅভিযান হয়েছিল ।সিধু-কানুর নেতৃত্বে সংগঠিত সেই ‘কলকাতা অভিযান ‘ছিল বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম লং-মার্চ ।

‘হুল ‘এর প্রাসঙ্গিকতা: –

যে সব কারণের ভিত্তিভূমিতে হুল এর প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল, সেই কারণগুলো আজও স্বাধীন ভারতবর্ষের বুকে আদিবাসী, দলিত, নিম্নবর্গের শ্রমজীবী, মেহনতি মানুষের সামনে বিভিন্নভাবে বিদ্যমান ।আজও জমি লুঠ, উচ্ছেদ চলছে ।জমিদারি ও মহাজনী প্রথা নিত্যনতুন কৌশলে টিকে আছে । দেশের ভূমিপুত্রদের বুনিয়াদি অধিকারকে নস্যাত করে দেওয়ার ঘৃণ্য অপপ্রচেষ্টা অব্যাহত ।

লজ্জার বিষয়, গত ১৩ই জুন ২০২০ বীর সিধু-কানুদের বংশধর রামেশ্বর মুরমু কে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হলো ।

এইরকম এক সংকটময় পরিস্থিতিতে সিধু-কানু-চাঁদ-ভৈরবরা খুবই প্রাসঙ্গিক ।সিধু-কানুদের রক্ত কখনো বেইমানি করে না ।সীমাহীন শোষণ-বঞ্চনায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সাঁওতালরা প্রবল প্রতাপশালী বৃটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের দীপশিখা জ্বালিয়েছিল ।বহু লড়াই, সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট সিধু-কানুদের বংশধরেরা সেই লড়াই ভুলে যায় নি;ভুলে যায় নি তির-ধনুক ধরতে ।শোষন, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সেই লড়াই আবারো হবে ।আবারো হবে সচেতনভাবে, সংগঠিতভাবে, সুসংবদ্ধভাবে ।।

- Advertisement -

Latest news

ডেঙ্গু বিজয় অভিযান আসানসোলে।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডেঙ্গু বিজয় অভিযানের অংশ হিসেবে আজ কুলটিতে ডেঙ্গু বিজয় অভিযান শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে কুলটি বোরো অফিস...
- Advertisement -

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে ছাড়া হল জল।

গ্রাম বাংলাঃ মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে নদীতে ছাড়া হল জল। সেচ দফতর সূত্রে খবর, মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে পাঁচ হাজার কিউসেক জল...

সাধনা ও শান্তির স্থান পঞ্চবটির হোল শুভ উদ্বোধন।

নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব মেদিনীপুরঃ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মাতৃ দর্শনের ঐতিহ্য ও তার সাধনাস্থলের মনোরম পরিবেশের কথা মাথায় রেখে পঞ্চবটী বনের  শুভ...

জলপাইগুড়ি চা বাগান থেকে উদ্ধার বিশাল অজগর।

সম্পা ভট্টাচার্য, জলপাইগুড়ি:-কালচিনি ব্লকের ডীমা চা বাগান থেকে একটি বিশালাকার অজগর উদ্ধার করল বনকর্মীরা । শনিবার সকালে ডীমা চা বাগানের বীচ লাইনে...

Related news

ডেঙ্গু বিজয় অভিযান আসানসোলে।

গ্রাম বাংলা, বাঁকুড়া:- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডেঙ্গু বিজয় অভিযানের অংশ হিসেবে আজ কুলটিতে ডেঙ্গু বিজয় অভিযান শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে কুলটি বোরো অফিস...

মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে ছাড়া হল জল।

গ্রাম বাংলাঃ মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে নদীতে ছাড়া হল জল। সেচ দফতর সূত্রে খবর, মুকুটমনিপুর জলাধার থেকে কংসাবতী নদীতে পাঁচ হাজার কিউসেক জল...

সাধনা ও শান্তির স্থান পঞ্চবটির হোল শুভ উদ্বোধন।

নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব মেদিনীপুরঃ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মাতৃ দর্শনের ঐতিহ্য ও তার সাধনাস্থলের মনোরম পরিবেশের কথা মাথায় রেখে পঞ্চবটী বনের  শুভ...

জলপাইগুড়ি চা বাগান থেকে উদ্ধার বিশাল অজগর।

সম্পা ভট্টাচার্য, জলপাইগুড়ি:-কালচিনি ব্লকের ডীমা চা বাগান থেকে একটি বিশালাকার অজগর উদ্ধার করল বনকর্মীরা । শনিবার সকালে ডীমা চা বাগানের বীচ লাইনে...
- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here