রাঢ়ের লোকসংস্কৃতি – টুসু পরব।

- Advertisement -
- Advertisement -

কলমে – সুকুমার মাহাত, শিক্ষক, গড়গড়্যা সুভাষ হাইস্কুল।

লোকসংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি ইংরেজী Folklore শব্দটি। এই Folklore এর Folk শব্দের প্রতিশব্দ লোক। এই “লোক” আমাদের “তথাকথিত ভদ্র” সমাজের বাইরে সমাজের নীচুতলার মানুষজন – খুবই সাধারণ শ্রেনীর জনসাধারন। আর Lore শব্দের অর্থ “জ্ঞান আহরণ”। লোক সমাজের মানস কর্ষণজাত ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন কলা, যেমন নাচ, গান, শিল্প, সাহিত্য, ব্রতকথা, আছার-আচরণ, পরব-পার্বণ, ধর্ম ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় এই Lore শব্দের  অন্তর্গত। তাই এককথায় লোকসংস্কৃতি বা Folklore শব্দের অর্থ – জনগনের মানস কর্ষণজাত জ্ঞান।

লোকসংস্কৃতির মূল কথাই হল মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। সমাজের দলিত, নিষ্পেষিত, অবহেলিত মানুষের নিদারুণ মানবিক অবস্থার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ। লোকসংস্কৃতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মের মোড়কে আবৃত।  লোকধর্ম যেহেতু জনগনের ধর্মবিশ্বাস তাই সেখানে বিশেষ কোন ধর্মের অধিমানসিকতা বা Intellectualism এর কোন স্থান নেই। অতীত এবং বর্তমান প্রতিটি সমাজেই সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে কিছু ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার আচরণ – রীতি – পদ্ধতি গড়ে উঠেছে।

বাংলার এই মালভূমি অঞ্চলটি যেটি রাঢ় বাংলা নামে পরিচিত সেটি অতি প্রাচীন ভূ-খন্ড। এখানে প্রাগৈতিহাসিক জীবনচিত্র আদিম জনগোষ্ঠীর সুনিপুণ কর্ম- প্রচেষ্ঠার পরিচয় দেয়। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান জেলার সুবিস্তীর্ণ অসমতল, জঙ্গলাকীর্ণ প্রাগৈতিহাসিক পর্বতমালা ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা, বহু নদনদীর প্রবাহিত স্রোতধারা এই প্রাচীন ভূখণ্ডকে দীর্ণ – বিদীর্ণ করেছে বারবার। কৃষি নির্ভর এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা আবর্তিত হয়েছে প্রকৃতি নির্ভর কৃষিকে কেন্দ্র করে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির মূলে যেমন মানুষের সীমাহীন চাহিদা, চাহিদা পুরনের কামনা ও প্রচেষ্ঠা। তেমনই রাঢ়ের লোকধর্ম পালনের মধ্যেও এই চাহিদা ও চাহিদা পূরণের কামনা বর্তমান।

প্রকৃতি নির্ভর কৃষি প্রধান বিভিন্ন উপজাতি অধ্যুষিত রাঢ় অঞ্চলের আদিবাসীদের অগ্রহায়ণ মাসে মাঠ ভরা পাকা ধান চাষির খামারে আসতে শুরু করেছে। পৌষ মাসে ফসল ঝাড়াই মাড়াই করে চাষির ঘর তখন শস্যে পরিপূর্ণ। বছরের অধিকাংশ সময় ভরপেট খাবার না পাওয়া মানুষ গুলোর তখন খাবারের অভাব নেই। সেই আনন্দেই খেটে খাওয়া “ছোটো লোক” গুলোর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটে টুসু পরবের মধ্য দিয়ে।

পৌষ মাসের শুরুতেই মেয়েরা বাড়িতে টুসু বসায়। সারা মাস ধরে প্রতি সন্ধ্যায় পাড়ার সব মেয়েরা নিজ নিজ টুসু নিয়ে একত্রে গান গায়। এই গান তাদের স্বরচিত, জীবনের সুখ দুঃখের বিলাপ বা সমসাময়িক কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হয়। সমাজ জীবনের নানান ঘাত প্রতিঘাত, ব্যাতিক্রমী ঘটনা, নারী জীবনের বিভিন্ন দিক এই গানগুলিতে প্রতিফলিত হয়। বৈষ্ণব কবি যেমন শ্রীরাধার মুখ দিয়ে নিজ হৃদয়ের বেদনা প্রকাশ করেন। রাঢ়ের মেয়েরা (মূলত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম) টুসুকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে নিজেদের অব্যাক্ত কথাগুলি প্রকাশ করেন। যেমন বিবাহিতা নারী, যে একটি পরিবারের গৃহবধূ, সে বাপের বাড়ী যেতে পারেনি; সে গাইছে –

“দাদা মেরে বিহা দিলি বড় নদীর উপারে,

এত বড় পৌষ পরবে রাখলি রে পরের ঘরে।

পরের ঘরে মন কেমন করে,

যেমন – শোল মাছে উফাল মারে।”

তেমনি পিতৃহীন অবিবাহিতা মেয়ে তার জীবনের দুঃখ গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করছে –

“ভাই ভালো তো, ভাজে গাল দিছে,

যেমন ভাবরি খাড়ায় জ্বাল দিছে”।

এই টুসু পরবের মূল মেলা স্থান ছিল বাঁকুড়া জেলার খাতড়া ব্লকের পরকূল গ্রামে, কাঁসাই নদীর তীরে। বর্তমানে যদিও বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে।  তো, দীর্ঘদিন ধরেই পরকুল মেলায় যাওয়ার ইচ্ছে, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠে না। তাই নারীরা গান ধরে –

“পরকুল যাবো মনে করি,

পরকুল যাওয়া হইল নাই;

এই বছরটা যেমন তেমন –

আসছে বছর মানবো নাই।”

আবার সমষ্টিগত ভাবেও গান গাওয়া হয়ে থাকে –

“কংসাবতী পরিকল্পনা –

দেশে ফলছে হে, সবুজ সোনা।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, টুসুর কোন মূর্তি হয়না, চৌদল নিয়েই মেলাতে টুসুর নাচ-গান হয়ে থাকে। বর্তমানে অবশ্য অনেক স্থানেই ভাদুর আদলে টুসুর মূর্তি বানিয়ে টুসু পুজো ও গান হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও টুসুকে পুরুষ মূর্তিতেও দেখতে পাওয়া যায়। টুসু পরব বা মকর পরব উপলক্ষ্যে পৌষ সংক্রান্তিতে মেলা হলেও এটি আসলে একাধিক দিনের পরব। তাই রাঢ় বঙ্গের প্রচলিত কথা –

“চাউড়ী, বাঊড়ি, মকর ডুব,

 এখ্যান ঘেঘ্যান, সাই সুই,

তার পরদিন আসবি তুই।” সপ্তাহব্যাপী এই আনন্দ যজ্ঞে কিন্তু কোন শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধের ঘেরাটোপ নেই। এ যেন ভুখা মানুষের উদরান্ন পূর্তির মহোল্লাসের বহিঃপ্রকাশ।  

- Advertisement -

Latest news

উত্তর হাওড়ায় ঐতিহ্যবাহী শীতলা মায়ের স্নানযাত্রা এবার সরাসরি দেখানো হচ্ছে সিটি পুলিশের ফেসবুক লাইভে। ভীড় এড়াতে ঘরে বসেই লাইভ দেখার ব্যবস্থা।

নিজস্ব সংবাদদাতা, হাওড়াঃ- উত্তর হাওড়ায় ঐতিহ্যবাহী শীতলা মায়ের স্নানযাত্রা এবার সরাসরি দেখানো হচ্ছে সিটি পুলিশের ফেসবুক লাইভে। করোনা পরিস্থিতিতে ভীড় এড়াতে ঘরে...
- Advertisement -

কয়লা পাচার কাণ্ডে হাওড়াতেও তল্লাশি ইডির।

নিজস্ব সংবাদদাতা, হাওড়াঃ- কয়লা পাচার কান্ডের তদন্তে নামল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ( ইডি )। শুক্রবার সকাল থেকে কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হানা...

BREAKING NEWS: বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা আজ।

গ্রাম বাংলানিউজডেস্ক: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষিত হতে চলেছে আজ। সুত্রের খবর ভারতীয় নির্বাচন আয়োগ আজ বিকেল সাড়ে চারটার সময় পশ্চিমবঙ্গ...

নদীয়া জেলার রানাঘাট রামনগরে তৃণমূলছাত্র পরিষদের প্রকাশ্য সমাবেশ।

নদীয়া :- কেন্দ্রীয় কৃষি বিলের প্রতিবাদে, পেট্রোল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য জনসভার ডাক দিয়েছিল নদীয়া জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। আজ সন্ধ্যায় এই অনুষ্ঠানে...

Related news

উত্তর হাওড়ায় ঐতিহ্যবাহী শীতলা মায়ের স্নানযাত্রা এবার সরাসরি দেখানো হচ্ছে সিটি পুলিশের ফেসবুক লাইভে। ভীড় এড়াতে ঘরে বসেই লাইভ দেখার ব্যবস্থা।

নিজস্ব সংবাদদাতা, হাওড়াঃ- উত্তর হাওড়ায় ঐতিহ্যবাহী শীতলা মায়ের স্নানযাত্রা এবার সরাসরি দেখানো হচ্ছে সিটি পুলিশের ফেসবুক লাইভে। করোনা পরিস্থিতিতে ভীড় এড়াতে ঘরে...

কয়লা পাচার কাণ্ডে হাওড়াতেও তল্লাশি ইডির।

নিজস্ব সংবাদদাতা, হাওড়াঃ- কয়লা পাচার কান্ডের তদন্তে নামল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ( ইডি )। শুক্রবার সকাল থেকে কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় হানা...

BREAKING NEWS: বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা আজ।

গ্রাম বাংলানিউজডেস্ক: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষিত হতে চলেছে আজ। সুত্রের খবর ভারতীয় নির্বাচন আয়োগ আজ বিকেল সাড়ে চারটার সময় পশ্চিমবঙ্গ...

নদীয়া জেলার রানাঘাট রামনগরে তৃণমূলছাত্র পরিষদের প্রকাশ্য সমাবেশ।

নদীয়া :- কেন্দ্রীয় কৃষি বিলের প্রতিবাদে, পেট্রোল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য জনসভার ডাক দিয়েছিল নদীয়া জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। আজ সন্ধ্যায় এই অনুষ্ঠানে...
- Advertisement -

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here