সপ্তদশ সেনসাসের দ্বারপ্রান্তে: ১৫৪ বছর আগে পুরুলিয়া জেলায় কেমনভাবে হয়েছিল প্রথম জনগণনা?
কলমে:- সুখরঞ্জন মুখার্জী
বিশেষ নিবন্ধ:- আগামীকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে ভারতের সপ্তদশ জনগণনা। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটি এক বিশেষ মুহূর্ত, কারণ দীর্ঘ বিরতির পর আবার দেশের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি বাড়ি এবং প্রতিটি জনপদের তথ্য এক বিশাল প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। আজ যখন আধুনিক মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল ম্যাপিং, জিপিএস এবং অনলাইন তথ্যভাণ্ডারের যুগে আমরা নতুন সেনসাসের সূচনা দেখতে চলেছি, তখন মনে পড়ে যায় ঠিক ১৫৪ বছর আগের সেই সময়ের কথা -যখন প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ ভারত সরকার সমগ্র দেশে একটি সুসংগঠিত জনগণনার উদ্যোগ নিয়েছিল।
বর্তমান পুরুলিয়া জেলা তখন পৃথক জেলা ছিল না; এটি ছিল বিশাল মানভূম জেলার অংশ। ১৮৭২ সালের সেই জনগণনার কাহিনি আজও সংরক্ষিত আছে স্যার ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টারের বিখ্যাত গ্রন্থ A Statistical Account of Bengal, Volume XVII: Manbhum (১৮৭৭)-এ। সেই বিবরণ শুধু একটি জনগণনার ইতিহাস নয়; এটি আমাদের জেলার প্রশাসনিক, সামাজিক ও জনজীবনের এক জীবন্ত দলিল।

আজকের পুরুলিয়া জেলার মানচিত্র মাথায় রেখে ১৮৭২ সালের মানভূম কল্পনা করলে ভুল হবে। তখনকার জেলা ছিল বর্তমান পুরুলিয়া ছাড়াও বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ ও আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত। প্রশাসনিকভাবে জেলা দুটি মহকুমায় বিভক্ত ছিল—সদর বা হেডকোয়ার্টার্স মহকুমা এবং গোবিন্দপুর মহকুমা।
সদর মহকুমার অন্তর্গত ছিল বরাভূম, চাস (বর্তমানে ঝাড়খন্ড রাজ্যে), গৌরাঙ্গডি(বর্তমানে ঝাড়খন্ড রাজ্যে),পুরুলিয়া, রায়পুর (বর্তমানে বাঁকুড়া জেলা) রঘুনাথপুর, সুপুর (বর্তমানে বাঁকুড়া জেলা) এই সাতটি থানা। অন্যদিকে গোবিন্দপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত ছিল গোবিন্দপুর, নিরসা এবং তোপচাচি থানা (সবগুলিই বর্তমানে ঝাড়খন্ডে)।
হান্টারের বর্ণনা পড়লে বোঝা যায়, সেই সময়েও জনগণনা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত প্রশাসনিক অভিযান। ততকালীন মানভূম জেলার ডেপুটি কমিশনার (বর্তমানে জেলাশাসকের সঙ্গে তুলনীয়) চার্লস ক্যাসল স্টিভেন্স (আই সি এস)-এর নেতৃত্বে এই জনগননার কাজ পরিচালিত হয়েছিল।
সমগ্র জেলাকে ২৫টি Census Block-এ ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি ব্লকে সর্বোচ্চ সাত হাজার বাড়ি রাখার চেষ্টা করা হয়। ডেপুটি কমিশনার তাঁর রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন যে এই কাজে স্থানীয় জমিদারদের সাহায্য পাওয়া যায় নি। তাই এজেন্সির মাধ্যমে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এনোমোরেটারদের নিয়োগ করা হয় । প্রতিটি এনোমোরেটারকে তার নির্দিষ্ট এলাকার গ্রামের তালিকা দেওয়া হতো।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। হান্টার স্পষ্ট লিখেছেন, তালিকাভুক্ত “গ্রাম” আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৌজা। কোনো কোনো মৌজার মধ্যে একাধিক গ্রামের অস্তিত্ব থাকলেও, যেহেতু তাদের পৃথক সীমানা নির্ধারিত ছিল না, তাই জনগণনার জন্য প্রতিটি মৌজাকেই একটি পৃথক গ্রাম হিসেবে গণ্য করা হয়।(উল্লেখ্য যে বর্তমান সেন্সাসেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে)

প্রতিটি গণনাকারীকে প্রতিদিন ৭৫টি বাড়ি গণনার নির্দেশ ছিল। নির্দিষ্ট সময় অন্তর তারা থানায় রিপোর্ট জমা দিতেন। কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৭১ সালের নভেম্বর মাসে এবং ১৮৭২ সালের শুরুতেই তা শেষ হয়।
১৮৭২ সালের সেন্সাসে ছিল মাত্র ১৭-টি প্রশ্ন – প্রথমেই বাড়ির নম্বর এবং বাড়ির ধরন—পাকা, টালির না খড়ের—লেখা হতো। তারপর পুরুষ সদস্যদের নাম, বয়স, ধর্ম, জাত বা শ্রেণি, জন্মদেশ বা জাতীয়তা এবং পেশা নথিভুক্ত করা হতো। বিশ বছরের কম বয়সী কেউ স্কুল বা কলেজে পড়ে কি না, এবং পড়তে-লিখতে পারে কি না—সেটিও আলাদা করে লেখা হতো।
মহিলা সদস্যদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই তথ্য নেওয়া হতো। তবে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ব্যক্তিগত নামের পরিবর্তে “স্ত্রী”, “বিধবা”, “কন্যা” ইত্যাদি পরিচয়ও লেখা হতো।শেষ কলামে উল্লেখ করা হতো পরিবারের মধ্যে কতজন অন্ধ, বধির, বোবা, উন্মাদ, মানসিক প্রতিবন্ধী অথবা কুষ্ঠরোগী আছেন।
এই প্রশ্নগুলির অনেকগুলিই বর্তমান সেন্সাসের প্রশ্নাবলীর সাথে মিলে যায়।
জনগণনার শেষে ডেপুটি কমিশনার তাঁর রিপোর্টে লিখছেন -“এই জনগণনা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এ কাজে কেবল দক্ষ ব্যক্তিদেরই নিয়োগ করা হয়েছিল। সম্ভবত ঘন জঙ্গলের মধ্যে কয়েকটি বাড়ি নজর এড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাড়ি ও মানুষের সংখ্যা সামান্য কম ধরা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমার বিশ্বাস, জনগণনাটি অত্যন্ত সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
১৮৭২ সালের সরকারি ফলাফলে সমগ্র মানভূম জেলার আয়তন ছিল ৫,২১৪ বর্গমাইল। জেলার অন্তর্গত ছিল ৬,৩৬৮টি মৌজা (তৎকালীন গণনায় Village)। মোট বাড়ির সংখ্যা ছিল ১,৯৫,৬৬৫টি।মোট জনসংখ্যা ছিল ৯,৯৯,৫৭০ জন—অর্থাৎ প্রায় দশ লক্ষ।প্রতি বর্গমাইলে গড় জনঘনত্ব ছিল ২০৩ জন। থানা অনুসারে জনসংখ্যার তথ্য হান্টারের লেখা থেকেই হুবহু তুলে দেওয়া হল।
আগামীকাল যখন ভারতের সপ্তদশ জনগণনা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে, তখন মনে রাখা উচিত—এই যাত্রার শুরু আজ থেকে ১৫৪ বছর আগে। সেই সময় মানভূমের কোনো অজপাড়াগাঁয়ের খড়ের চালের বাড়িতে একজন গণনাকারী কলম ডুবিয়ে যে নাম লিখেছিলেন, আজ তার উত্তরসূরি হয়তো স্মার্টফোনে তথ্য নথিভুক্ত করবেন।
প্রযুক্তি বদলেছে, প্রশাসনিক সীমানা বদলেছে, মানভূম ভেঙে পুরুলিয়া আলাদা জেলা হয়েছে, কিন্তু জনগণনার মূল উদ্দেশ্য বদলায়নি- দেশের প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্রের নথিতে সমানভাবে স্থান দেওয়া।
হয়তো এই কারণেই ১৮৭২ সালের সেই প্রথম গণনার ইতিহাস আজও শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি বর্তমানের সেনসাসকেও নতুন অর্থে বুঝতে সাহায্য করে।

